Logo বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
.........
×

সদস্য তথ্য

আপনার নিবন্ধিত নাম এবং ফোন নম্বর দিন

×
Logo
বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
Photo

নাম

সদস্য

আইডি নং:

ফোন:

ব্লাড গ্রুপ:

Event Image
24 December, 2025

সংগীত কি ইসলাম ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক ?

বাঙালি মুসলমানের নিকট ধর্ম ও সংগীত দুটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। হাজার বছর ধরে এই অনুষঙ্গকে ধারণ করে বাঙালি মুসলমানের অগ্রযাত্রা সাধিত হয়েছে। সেই সুদূর অতীত থেকে এই দুই অনুষঙ্গ নিয়ে তেমন কোনো আপত্তি উত্থাপিত হয় নাই। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার জন্য সহকারী শিক্ষক নিয়োগ থেকে সরকার সরে আসার কারণে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। একবিংশ শতাব্দিতে যেখানে সমগ্র বিশ্ব জ্ঞান–বিজ্ঞানের সকল শাখাকে ধারণ করে দ্রুত উন্নতি সাধনে লিপ্ত, সেখানে এরূপ একটা সিদ্ধান্তের কারণ কী? এটা কি কোনো স্বার্থান্বেষী এবং পশ্চাৎপদ চিন্তার অধিকারী মহল কর্তৃক মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রাকে পেছনের দিকে ধাবিত করার অপচেষ্টা নয়? এই প্রসঙ্গে মাত্র কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রনেতার এই উক্তিটির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। তিনি বলেছেন, “কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে গানের শিক্ষক প্রদান করতে চান? গলা টেনে ছিঁড়ে ফেলব।” বাংলাদেশের মতো একটা হতদরিদ্র দেশ, যেখানে মানুষ তার জ্ঞান ও মননের বিকাশের জন্য অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে সংগীতকে ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে মানব প্রজাতিকে কোথায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।

সম্প্রতি গালফ নিউজে প্রকাশিত হয়েছে “প্রাথমিক স্কুল শিক্ষার অংশ হিসাবে ১৭,০০০ (সতেরো হাজার) সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে সৌদি আরব। শিশুদের অল্প বয়স থেকে সংগীত, শিল্প ও সৃজনশীলতা সম্পর্কে পরিচিত করতে এই উদ্যোগ নিয়েছে সে দেশের সরকার। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যৌথ তত্ত্বাবধানে কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে ইতিমধ্যে সংগীত প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। ২০২২ সালের শেষদিকে প্রথম ধাপে ১২,০০০ (বারো হাজার) এর অধিক নারী শিক্ষক প্রশিক্ষণ নেন। এবার দ্বিতীয় ধাপে গান, তাল, লয়, বাদ্যযন্ত্র ও স্থানীয় সংগীতসহ মৌলিক সংগীত শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা হবে।’’

কামাল আতাতুর্কের সময় থেকে তুরস্কে প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার “এডুকেশন ব্লু–প্রিন্ট ২০১৩–২০২৫” অনুযায়ী সংগীত শিক্ষা শিশুদের “সফ্ট স্কিল ও নৈতিক বিকাশের একটি অপরিহার্য অংশ।” মানবিক গুণাবলীকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে আরব আমিরাত ও কাতারের শিক্ষা ব্যবস্থায় সংগীত ও শিল্পকলাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া মনে করে সংগীত ও সংস্কৃতি শিশুদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন ও ধর্মীয় সহনশীলতা শেখায়।

অসংখ্য গবেষণা প্রমাণ করেছে, সংগীত শিক্ষা শিশুদের জ্ঞানের বিকাশ, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি করে। শিক্ষা শুধু তথ্য মুখস্থ করার বিষয় নয়; বরং শিশুকে অভিজ্ঞতা, কল্পনা এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা। সংগীত, শিল্পকলা ইত্যাদি শিশুদের অভিজ্ঞতার জগতকে বিস্তৃত করে, তাদের কল্পনাশক্তি ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়। অন্যদিকে সংকীর্ণ ও একমুখী শিক্ষা মানুষকে নিরব ভোক্তা, অনুগত ও পশ্চাৎপদ নাগরিক হিসেবে পরিণত করে; তাদের কল্পনা ও সমালোচনামূলক চেতনাকে দমন করে এক পর্যায়ে ধ্বংস করে ফেলে। বাংলাদেশে সংগীত শিক্ষার বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনকে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রতীয়মান হয় যে এটা শিশুদের মননকে এক নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে সংকুচিত ও ধ্বংস করার অপচেষ্টা, যার উদ্দেশ্য আনুগত্যশীল প্রজন্ম তৈরি করা। বাংলাদেশের সচেতন ও দেশপ্রেমিক জনগণ কি সেদিকে হাঁটতে চায়? এটা বিভিন্নভাবে বারবার উল্লেখ হয়েছে যে সংগীত, নৃত্যকলা ও যাবতীয় শিল্পকলা শিশুদের বিপথগামী তো করে না, বরং তাদের সুকুমার মনোবৃত্তির বিকাশ, কল্পনাশক্তি, নান্দনিকতা, মানবিক বোধকে জাগ্রত করার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যাতে শিশুর মন প্রগতিশীলতার পথে দ্রুত বিকাশিত হয়।

ইসলামে সংগীতচর্চা, কাব্যচর্চা, চিত্রাঙ্কন বা ভাস্কর্য নির্মাণ ইত্যাদিকে আল্লাহ হারাম করেননি। এসব বিষয় যেখানে আল্লাহ হারাম করেননি, সেখানে আল্লাহর রাসুল তা কীভাবে হারাম করেন? সংগীত ও এতদসংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন ইসলামী পণ্ডিতব্যক্তি ও চিন্তাবিদদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত দেখা যাক। সংগীতকে আল্লাহ যে হারাম করেননি, আল্লাহর রাসুলও হারাম করেননি এবং তাঁর সময়ে যে সংগীতচর্চা হতো ও তিনি যে গান শুনতেন তার বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। সূরা আরাফের ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ গুটিকয়েক খাদ্য, কাজ ও বিষয়কে হারাম করেছেন। এখানে যে চারটি বিষয়কে আল্লাহ হারাম করেছেন তা হলো—অশ্লীলতা, আল্লাহর নাফরমানি, অন্যায়–অত্যাচার চালানো এবং আল্লাহর সাথে শিরক করা। এগুলো বাদ দিয়ে সব কাজ নির্দ্বিধায় করার ক্ষেত্রে আপত্তি থাকার কথা নয়।

কিছু ব্যক্তি হাদিসের দোহাই দিয়ে বিয়ে বাড়িতে গান–বাজনা হারাম ফতোয়া দেন। বিয়ে বাড়িতে গান–বাজনা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন— “মসজিদে বিবাহ সম্পন্ন কর এবং ঢালাওভাবে প্রচার কর দফ বাজিয়ে।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৮৯৫, তিরমিজি শরিফ, হাদিস নং ১০৮৯)। একাধিক হাদিসে বলা হয়েছে— “হারাম ও হালালের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়কারী হলো বিয়ের সময়ে ঢালাওভাবে দফ বাজিয়ে প্রচার করা।” (তিরমিজি শরিফ, হাদিস নং ১০৮৮, নাসায়ী শরিফ, হাদিস নং ৩৩৬৯, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৮৯৬)। এসব আল্লাহর রাসুলের হুকুম। তাঁর এক নারী সাহাবী রুবাই বিনতে মুয়াবিস ইবনে আফরা বলেন— “তিনি (রাসুল) আমার ঘরে এসেছেন এবং বিছানার উপর বসেছেন। তখন কিছু মেয়ে দফ বাজিয়ে বদর যুদ্ধে শহীদ হওয়া সাহাবিদের শোকগাঁথা গাচ্ছিল।” (বোখারি শরিফ, হাদিস নং ৫১৪৩)।

কোরআনে মদ, সুদ, ব্যভিচার, ধর্মব্যবসা ইত্যাদিকে হারাম করা হয়েছে, অথচ একবারও কি বলা যেত না—সংগীতচর্চা, কাব্যচর্চা, গান গাওয়া বা বাজনা বাজানো হারাম। এমনকি কোরআনে আরবীতে কোথাও ‘গান’ শব্দটির উল্লেখ নেই। আরবি ভাষায় গানকে বলা হয় গি-না, শা-মা, নাগমা, মুসেকী—কিন্তু কোরআনে এই শব্দগুলোর কোনটিই নেই। হযরত দাউদ (আ.) বীনার মতো একটি বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, যার নাম হলো ‘হার্ফ’। হার্ফ হাতে তাঁর একটি ছবি ঐ সময়ে মুদ্রাতেও অঙ্কিত ছিল। তৎকালে মদিনায় শিশু–কিশোররা ধফ বাজিয়ে গান গাইত। মা আয়েশার ঘরে রাসুলের উপস্থিতিতে গানের আসর চলতো। তাঁর ঘরে দুটি মেয়ে ধফ বাজিয়ে গান গেয়েছিল। (বোখারি শরিফ, হাদিস নং ৯৮৭)। মা আয়েশা একটি মেয়েকে লালন–পালন করতেন। এই মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার পর রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করেন— “সে বাড়িতে এমন কাউকে রেখেছ কি, যে গান গাইতে ও বাজনা বাজাতে পারে? আনসাররা সংগীতপ্রেমী, গান পছন্দ করে।”

গান-বাজনা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালির বাঙালিয়ানা ও প্রাণের সাথে গান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাঙালি সুখে দুঃখে, আনন্দ-উল্লাসে, কাজে ও বিশ্রামে, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে, এমনকি প্রার্থনা ও মঙ্গলকার্যে গানকে তার নিত্য সঙ্গী করে নিয়েছে। গানকে বাঙালির জীবন ও সত্তা থেকে আলাদা করা প্রায়ই অসম্ভব। গান আমাদের ঐতিহ্যের সাথে, সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে। আমরা একদিকে বাঙালি, আরেকদিকে মুসলমান। যখন ইসলামিক দিক থেকে ফতোয়া আসে গান হারাম, তখন আমরা বিপদে পড়ে যাই। যেটা আমাদের অস্তিত্ব সেই বাঙালিত্বকে ত্যাগ করতে, তাকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারি না। যখন গানের সাথে একটা সংঘাত হচ্ছে তখন মুসলিম হিসেবে আমরা বড় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ি। এই বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে বাঙালি মুসলমান এক বিপদের মাঝে আছে। এছাড়া অনেকে বলছে গান হারাম, আবার সেই গানের মধ্যেই ডুবে থাকি। কারণ যারা এই ফতোয়াগুলো দিচ্ছেন তাদের অনেকে হয়তো সংগীত ও গান নিয়ে লেখাপড়া করেননি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম গানকে হারাম জেনে আসছেন। সেইভাবে আমরা জেনে আসছি যুগ যুগ ধরে।

পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে সংগীত নামে একটা ডিপার্টমেন্ট আছে। আমাদের দেশেও তা আছে। বাইরের দেশেও বিভিন্ন বিভাগ আছে যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন ঘরানার সংগীত নিয়ে পড়ানো হয়। তার কারণ হল, সংগীত যেমন একটা মানুষের নিরন্তর সহযাত্রী হয়ে তাকে সবসময় আনন্দ দিতে প্রয়াস পায়, তার দুঃখ ঘুচাতে সচেষ্ট থাকে; অন্যদিকে তার সাথে সমস্ত জনগোষ্ঠীর এবং সমস্ত পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে কাজ করে। সংগীত শুধু অলস মুহূর্তের সময়ক্ষেপণ নয়, ব্যাপক জনগণের সম্পৃক্ততার ফলে তা আন্দোলন-সংগ্রাম ও মানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ারেও পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত আমরা সংগীতকে দেখতে পাচ্ছি রাজপথ ও জনপথে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। এ প্রসঙ্গে আমরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে এবং জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কাজী নজরুল ইসলাম, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, মুকুন্দ দাসসহ অনেকের কথা স্মরণ করতে পারি। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি বলেছেন, “ক্ষুধার্থ লোকের সামনে বড়লোকের খাওয়ার সময়ের কাঁটাচামচের আওয়াজ ছাড়া সব সংগীত হালাল।’’ সংগীতবিহীন কোনো মুসলিম সমাজ অতীতেও ছিল না, এখনও নেই।

কিতাবের সাথে বাস্তবের সংঘাত কেন হচ্ছে ? হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবাদকৃত দ্বিতীয় শহর হল বসরা। আরবি ব্যাকরণ, আরবি শাস্ত্র ও সংগীতশাস্ত্র—এই শহরের অবদান। উসমানীয় সাম্রাজ্যের জ্ঞানভাণ্ডারে সংগীতাংশের এক বিশাল অবস্থান। উসমানীয় খেলাফত কালে ধ্রুপদী সংগীতের একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। কয়েকজন সুলতান নিজেরাও শিল্পী ও সুরকার ছিলেন। বাইজেন্টাইন, আর্মেনীয়, আরবি ও ফারসি সংগীত উসমানীয় সংগীতের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁরা জাতীয় সংগীতের প্রচলন করেছিলেন।

শিরক ও অশ্লিতা ছাড়া সব গান বৈধ- এই মর্মে অনেক ইসলামী স্কলার মত প্রকাশ করেছেন। ড. ইউসুফ গাজ্জালী বলেছেন, “বহুসংখ্যক সাহাবী ও তাবেইন গান শুনেছেন এবং এতে কোন দোষ মনে করেননি। সংগীতের নিষেধমূলক হাদিসগুলি সমালোচনার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত।’’ আবু বকর ইবনে হারাবী বলেছেন, “গান হারাম হওয়া কোনো একটা হাদিসই সহীহ নয়, এইসব বর্ণনা বাতিল ও মন্দ।” এমনকি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার শাহ আব্দুল হান্নান তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন ইসলামী স্কলারদের সংগীত বিষয়ে ইতিবাচক মতামতের কথা বলেছেন। এই সাক্ষাৎকারটি এখনও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে পাওয়া যায়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসংগীতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এর বিরুদ্ধেও প্রতিবাদের অগ্রভাগে ছিলেন একজন মাওলানা, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আল আজহার ইউনিভার্সিটির Fatwa on music by the Grand Mufti and Shaykh of Al-Azhar বলেন— ‘‘গুনাহযুক্ত না থাকলে, হারামের দিকে না টানলে এবং ফরজ ইবাদত থেকে না সরিয়ে নিলে সংগীত শোনা, সংগীত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা এবং বাদ্যযন্ত্র বৈধ।’’

সংগীত প্রসঙ্গে কোরআন, হাদিস ও শরিয়াহ্ কি বলছে; কোরআনে যে দু’টি আয়াত দিয়ে সংগীতকে হারাম বলার চেষ্টা করা হয় তার একটি হল আয়াত নং ৬৪, সূরা বনি ইসরাঈল। যার বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ :
শয়তানকে আল্লাহ বলছেন-

"তুই সত্যচ্যুত করে তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস স্বীয় আওয়াজ দ্বারা, স্বীয় অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদেরকে আক্রমণ কর, তাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে শরীক হয়ে যা এবং তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দে। ছলনা ছাড়া শয়তান তাদেরকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না।"

এখানে আল্লাহ বিষয়টাকে সরাসরি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে সংগীত সম্পর্কে কিছুই পাওয়া যায় না। কিন্তু বিতর্কটা আসে, যখন তফসীরে (ব্যাখ্যায়) যাওয়া হয়। যেমন তাফসীরে আহসানুল বায়ানে আছে-

"আওয়াজ বলতে প্রতারণামূলক আহ্বান অথবা গান-বাজনা ও রঙ-তামাশার আরও অন্যান্য শব্দ। যার মাধ্যমে শয়তান অধিকহারে লোকদেরকে ভ্রষ্ট করছে।"

এ বিষয়ে অন্য আয়াতটি হল সূরা লুকমানের ৬ নং আয়াত যার বাংলা অনুবাদ এখানে দেওয়া হল।

"এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং উহাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।"

এই আয়াতেও সংগীতের কোনো উল্লেখ নাই। কিন্তু বিভ্রান্তিটা আসে তখনই যখন এর ব্যাখ্যা নিম্নরূপ করা হয়।

"এই আয়াতটি সেই সব মানুষকে উদ্দেশ্য করে যারা আল্লাহ থেকে মানুষকে দূরে সরানোর জন্য ভিত্তিহীন কথা, গান-বাজনা, বিনোদন ইত্যাদি সংগ্রহ করে এবং এগুলো দ্বারা আল্লাহর পথ নিয়ে উপহাস করে।"

এই অবান্তর কথাবার্তা, গল্পগুজব করা, ফালতু কথা বলা, যা জীবনের অংশ—সেগুলো কেন সংগীত হতে যাবে ? এটা কোনো যুক্তি নয়, তাই এটা বর্জন করেছে মুসলিম বিশ্ব। যেখানে হারামের ফর্দ স্পষ্ট করে কোরআনে বিভিন্ন স্থানে বারংবার উল্লেখ আছে, সেখানে সংগীত যদি হারাম হতো তবে তার অবশ্যই উল্লেখ থাকত। এই মতামত বহুসংখ্যক ইসলামী স্কলারের। কোরআনে যা নেই, তা কোরআনের বিধান কী করে হয় ? এই মর্মে কোরআনে আরেকটা আয়াত আছে—“ওরা নিজেরা রচিত করে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয়।” শয়তানকে বলা হয়েছে, “মানুষকে গোমরাহ করার জন্য তোমাকে সব শক্তি দেওয়া হল।” কী কী আছে শয়তানকে প্রদত্ত এই শক্তিসমূহের মাঝে? এর একটা নাকি ‘সাউত’, যার অর্থ আওয়াজ, আর এই আওয়াজই নাকি সংগীত ! হাজারো রকমের আওয়াজ আছে দুনিয়াতে। এই সমস্ত দুর্বল যুক্তির জন্য বিশ্ব মুসলিম সংগীতকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করেননি। সংগীত মানুষকে ইসলাম থেকে সরিয়ে দেয়—একথাটা অদ্ভুত। ভারতীয় সংগীত—ধ্রুপদী, খেয়াল ও ঠুমরির উত্থান ও বিকাশ হয়েছে বড় বড় সব মুসলিম সংগীতজ্ঞদের হাত ধরে। তাঁদের এই অবদান সমগ্র বিশ্ব কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে। মিশরে তিনটি পিরামিড আছে, আর একজন সংগীতশিল্পীকে ৪র্থ পিরামিড বলা হয়। তাঁর নাম উম্মে কুলসুম, যিনি কোরআনে হাফেজ ছিলেন। সংগীত জগতে জনপ্রিয়তার দিকে মাইকেল জ্যাকসন, লতা মুঙ্গেশকর এবং উম্মে কুলসুম—এরা প্রায় সমপর্যায়ে পড়েন।

সুফি আবু হাফস সুলাইদী লিখেছেন, তাঁরা সংগীতের মধ্যে দিয়ে আল্লাহকে স্পর্শ করতে পারেন। আল্লাহ তাঁদের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেন সংগীতের ভিতর দিয়ে। এটা কীভাবে হয়, সকলের পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়। কিন্তু এটা সুফিদের দর্শন। পশ্চিমা বিশ্বে মিউজিক থেরাপিস্ট আছে, এটা অত্যন্ত সম্মানিত পেশা। এই পেশায় পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে প্রবেশ করতে হয়। সংগীতের মাধ্যমে রোগ নিরাময়—এটা যে কত আনন্দের ও সুবিধার, তা কি কখনও মানুষ বর্জন করতে পারে?

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে খুবই এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। তারুণ্যের আবেগ, অনুভূতি ও দেশপ্রেমকে গানের মাধ্যমে ধারণ ও প্রচার করে এই বেতার কেন্দ্র আমাদের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে তার কোনো তুলনা হয় না। গান যদি হারাম হয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং এই যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাঁদেরকে কি অপমান করা হয় না ?

প্রাচীন গুহাবাসী জনগণ শিকারে যাওয়ার পূর্বে সম্ভাব্য শিকারোপযোগী জীবজন্তুর ছবি গুহার দেয়ালে এঁকে রাখত এবং যখন ভাল শিকার পাওয়া যেত তখন সেটাকে গুহায় এনে তার চারদিকে নাচ-গান করত। আলেমরা দাবি করেন, ইসলাম ফিতরতের অর্থাৎ স্বভাবজাত ধর্ম। সংগীত মানুষের একটা স্বভাবজাত প্রবৃত্তি; এটাকে বাদ দেওয়া মানুষ কখনও গ্রহণ করেনি এবং করবেও না। অথচ কিছু লোক দিনরাত গবেষণা করেই যাচ্ছে—কোরআনে যা হারাম করা হয়নি, তাকে কীভাবে হারাম করা যায়। সংগীত মস্তিষ্ক ও প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়া। এই মিথস্ক্রিয়া সৃজনশীলতার জন্ম দেয়। যখন বাদ্যযন্ত্র ছিল না তখনও গান ছিল। নতুন কিছু সৃষ্টি করা মানুষ প্রকৃতি থেকে পেয়েছে।

পাকিস্তানের অন্যতম জাতীয় কবি এবং বাংলাভাষায় পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা। তিনি ইসলাম ও সঙ্গীত শিরোনামে কয়েকটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন, যেগুলো গাইডেন্স পাবলিকেশনস কর্তৃক প্রকাশিত গোলাম মোস্তফা সমগ্র, পৃষ্ঠা ৭৩ থেকে ৮১ এবং ৩২৩ থেকে ৩২৮-এ সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে সেখান থেকে কয়েকটা উদ্ধৃতি দেওয়া হলো। “সঙ্গীতকে এক শ্রেণীর মৌলভী সাহেবরা নিষিদ্ধ বলে ফতোয়া দিলেও ইসলাম কিন্তু সঙ্গীতের সঙ্গে চিরবিজড়িত। মুসলমানের কোরআন-হাদিস এবং সুদীর্ঘ ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইতিহাসই তার প্রমাণ। আশ্চর্যের বিষয় ! খোদা যেখানে নীরব, রাসুল যেখানে নীরব, খলিফাতুল মুমিনীনরা যেখানে প্রশ্রয়দাতা, সেখানে আজ তেরো শ' বছর পরে এতদ্দেশীয় এক শ্রেণীর মৌলভীরা পঞ্চমুখ হয়ে ফতোয়া দিচ্ছেন যে গান বিলকুল হারাম। যেন সঙ্গীতের এই সমস্যা স্বয়ং আল্লাহ, রাসুল বা খলিফাদের জানা ছিল না। যেন মুসলমান আমলের শরিয়তপন্থী বড় বড় বাদশাহ, কাজী, মুফতি প্রভৃতি কারও মনেই এ সমস্যার উদয় হয়নি, অথবা তাঁরা যেন কেউ-ই এ সমস্যা সমাধান করবার যোগ্যতা রাখতেন না।’’ “সঙ্গীত মানুষের মনকে প্রশস্ত করে সব ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে এক প্রেমসুন্দর আনন্দলোকে নিয়ে যায়।’’ “সঙ্গীত আমাদের জীবনে অনির্বচনীয়ের স্পর্শ আনুক, সমস্ত ক্ষুদ্রতার গণ্ডী কেটে ঊর্ধ্বে উঠবার শক্তি দিক; মনের দিকচক্রবালকে সম্প্রসারিত করুক, আমাদের সকল কাজে সৌন্দর্য, সঙ্গতি ও শৃঙ্খলা আনুক—সকল মলিনতাকে ধুয়ে দিয়ে সে আমাদিগকে সুন্দর, সরস ও পবিত্র করুক, -এই কামনা করি।’’

মানুষের ক্ষমতার লড়াই শুধু সামাজিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা বরং সংস্কৃতি, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে। এক শ্রেণীর মানুষ অবিরাম চেষ্টা করে সাধারণ জনগণকে তাদের সুদীর্ঘকাল থেকে সঞ্চিত কষ্টার্জিত জ্ঞান ও উৎকর্ষ থেকে বঞ্চিত করতে, যাতে তারা চিরকাল অনুগত হয়ে থাকে এবং কোনো প্রকার প্রশ্ন করতে না শিখে। দেশের আগামী প্রজন্ম কোমলমতি শিশুদেরকে সঙ্গীত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখার পরিকল্পনা হলো এদেরকে প্রশ্ন করা এবং মস্তিষ্কের সৃজনশীল বিকাশ থেকে বঞ্চিত রেখে অনুগত জীবে পরিণত করা।


এ.এস.এম. কামাল উদ্দিন, সভাপতি, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
ফিরে যান